সারোয়ার সবুজ:- মাত্র ৯ মাসের কার্যকালে গোদাগাড়ীবাসীর হৃদয়ে ঠাঁই করে নেওয়া মানবিক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদের আকস্মিক বদলিতে গোটা উপজেলাজুড়ে গভীর হতাশা নেমে এসেছে।
গত ২৬ নভেম্বর তাঁকে বদলি করে নতুন ইউএনও হিসেবে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মোঃ নাজমুস সাদাত রত্নকে (১৮৮৩৭) পদায়ন করা হয়।
মানবিক এই ইউএনওর হটাৎ বদলির কারণে তিন দিনের জন্য আয়োজিত পিঠা উৎসব ও মেলা একদিনেই গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন উদ্যোক্তারা, যা সাধারণ মানুষের বিষণ্নতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফয়সাল আহমেদ তাঁর ৯ মাসের কর্মজীবনে গরীব, দুস্থ, বিধবা, মুক্তিযোদ্ধা, নির্যাতিত মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, মাঝি, জেলে, সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং যুবসমাজের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর অফিসে প্রবেশের জন্য কারো অনুমতির প্রয়োজন হতো না। তিনি গভীর মনোযোগ সহকারে সবার কথা শুনতেন এবং দ্রুত সমাধান দিতেন।
তাঁর হাত ধরে গোদাগাড়ীতে বাল্যবিয়ে, যৌতুক, মাদক, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, চুরি, ও ছিনতাই উল্লেখযোগ্য অংশে কমে এসেছিল। ভেজাল বিরোধী অভিযানে তিনি শতভাগ সফল ছিলেন। তিনি নিজেকে প্রশাসক হিসেবে নয়, বরং “সামাজসেবক” এবং “গোদাগাড়ীবাসীর কামলা” হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন এবং সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র-শনিবারও কাজ করতেন।
মাদক ও ভেজাল বিরোধী কঠোর অভিযান: গোদাগাড়ীর মাদকপ্রবণ এলাকায় জোরালো অভিযান পরিচালনা করেন।
উদ্যোক্তা তৈরি ও প্রশিক্ষণ: খাঁচায় মুরগি পালনের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিনামূল্যে ৮টি করে মুরগি বিতরণ, সেলাই, মালি ও মুচিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।
জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা: চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নবাসীর জন্য স্পিডবোর্ডের ব্যবস্থা করেন, যাতে ১ ঘণ্টার পথ ১০-১৫ মিনিটে পাড়ি দেওয়া যায়।
আইনশৃঙ্খলা ও বিনোদন: পৌর সদরসহ গোল চত্বরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, যুবকদের মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার উপর গুরুত্ব দিয়ে ৯৯টি ক্লাব গঠন, খেলধুলার সামগ্রী বিতরণ ও পৌরসভা ও ইউনিয়নে মিনি শিশুপার্ক তৈরি করেন।
শিক্ষাবৃত্তি: গোদাগাড়ী পৌরসভার জন্মলগ্নে শিক্ষাবৃত্তি চালু করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
গণশুনানি: নিজ কার্যালয়ে বসে গণশুনানির মাধ্যমে অনেক বড় বড় বিরোধ মিটিয়েছেন।
গোদাগাড়ীবাসীর দাবি, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেন তাঁকে আরও কিছুদিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেন। তাদের বিশ্বাস, ফয়সাল আহমেদ সুযোগ পেলে ৪৫০টির বেশি খাসপুকুর ইজারা দিয়ে সরকারের কোটি কোটি রাজস্ব আয় করার ব্যবস্থা এবং মাদকের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারতেন।
ফেসবুকে মাহাফুজুল বারী লিখেছেন, “এই দেশের সিস্টেমই খারাপ। কারো ভালো কাজ সহ্য হয় না। ১৭ বছরে কেউ যেটা করেনি টাকার লোভ না করে ইউএনও ফয়সাল আহমেদ সেটা করে দেখিয়েছেন। এই দেশে ভালো মানুষের জায়গা নেই এটাই তার প্রমাণ।”
বদলির বিষয়ে ইউএনও ফয়সাল আহমেদ বলেন, “আমরা সরকারি কর্মকর্তা। দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের স্বার্থে সরকার যেখানে চাইবে এখানেই আমাদের কাজ করে যেতে হবে। তবে গোদাগাড়ীবাসীর ভালোবাসার কথা সারাজীবন মনে থাকবে। আমি আপনাদের প্রশাসক হিসেবে নয়, কামলার মতো কাজ করেছি। যত দিন এখানে রিজিক ছিল, ছিলাম; ভালো কাজ করার চেষ্টা করেছি।”