রাজশাহী জেলা পরিষদের মালিকানাধীন রাজশাহী শহরের সিএন্ডবি মোড়ের শতকোটি টাকার ৬বিঘা জমি ওরিয়ন গ্রুপকে দিয়ে দেবার গোপন চুক্তি করেছেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মীর ইকবাল। কোন টেন্ডার ছাড়াই গোপনে ৯৯ বছরের জন্য এককালীন জমি লিজ দেয়ার গোপন অঙ্গিকারনামার পরামর্শক চুক্তিটি পাওয়া গেছে। এতে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মীর ইকবাল নিজেই হয়েছেন চুক্তিভিত্তিক ‘পরামর্শক’। তার পুত্র মীর ইশতিয়াক আহমেদ লিমন হয়েছেন সাক্ষি। গত বছরের ১৯ জুলাই চুক্তিপত্র তৈরির দিন চেয়ারম্যান মীর ইকবাল পরামর্শক ফির নামে ১০ কোটি টাকা নগদ ঘুষ নিয়েছেন।তবে মীর ইকবাল দাবি করেছেন, এধরনের কোন চুক্তি বা পরামর্শক ফি তিনি নেননি। এমনকি ওরিয়ন গ্রুপকে চেনেন না দাবি করে বলেছেন পরামর্শক চুক্তিপত্রটি জাল।
তবে ওরিয়ন গ্রুপের পরিচালক আশফাক রহমান দাবি করেছেন, ‘রাজশাহীর হোটেল এক্সে বসে তিনি নগদ ১০ কোটি টাকা দিয়েছেন মীর ইকবালের হাতে। এসময় স্বাক্ষি সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান, বর্তমান পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী আব্দুল ওয়াদুদ দারা, মীর ইকবালের পুত্র রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইশতিয়াক আহমেদ লিমন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের সামনেই তিনি ১০ কোটি টাকা নগদ তুলে দেন মীর ইকবালের হাতে। এর তথ্য প্রমাণাদি হাতে রয়েছে।
’সচেতন মহল বলছে, মন্ত্রনালয়ের অনুমতি না নিয়ে কোন টেন্ডার ছাড়া কোনভাবেই তিনি এই সম্পত্তি ৯৯ বছরের জন্য এককালীন মালিকানা দিয়ে হস্তান্তর করতে পারেন না। ব্যক্তি স্বার্থে এই কাজটি করেছেন মীর ইকবাল।
এছাড়া স্থানটিতে রয়েছে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান মিলনায়তন। মাত্র ৫বছর আগে ২০১৯ সালে সাড়ে ৫ কোটি টাকার সংস্কার কাজ করে মিলনায়তনটি জেলা পরিষদকে হস্তান্তর করেন রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। এরমধ্যে ৩ কোটি ২১ লাখ টাকায় মিলনায়তনটির অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়। ভেতরের অত্যাধুনিক চেয়ার বসানো হয় ১ কোটি ২৬ লাখ টাকার। সাউন্ড সিস্টেম, সেন্টাল এসি, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনসহ সকল বৈদ্যুতিক কাজ করতে আরো ৯৭ লাখ ৪হাজার টাকা খরচ করা হয়। এটি ভেঙ্গে নতুন স্থাপনা করতে গেলে জনরোশের ঘটনা ঘটতে পারে।
চুক্তিপত্রে দেখা যায়, প্রথমপক্ষ হয়েছেন ওরিয়ন গ্রুপের পরিচালক আশফাক রহমান। দ্বিতীয় পক্ষে রয়েছেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মীর ইকবাল। উদ্দেশ্যের বর্ননায় বলা হয়েছে, প্রথমপক্ষ পরামর্শক মীর ইকবালকে ভাড়া করেছে নিম্নোক্ত কাজগুলো চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য।
এরমধ্যে রয়েছে শহরের সিএন্ডবি মোড়ের জেলা পরিষদের মালিকানাধীন চেয়ারম্যান মীর ইকবাল কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স’ এর জমিতে বহুতল ভবন হবে, যেখানে শপিং মল, আবাসিক এ্যাপার্টমেন্ট, কর্পোরেট স্পেস, অডিটোরিয়াম, আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং হবে। প্রথমপক্ষ পরামর্শকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে যে, তারা উল্লেখিত কাজগুলো করবে।
দ্বিতীয় পক্ষ বর্নিত জমিটি ৯৯বছরের জন্য সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। এব্যাপারে সরকারি নিয়মানুযায়ী সকল পূর্বশর্ত তারা পূরণ করবে। দ্বিতীয় পক্ষ আশ্বাস দিয়েছে যে, বর্তমানে স্থানটিতে যেসব অবকাঠামো রয়েছে যেমন, জেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম (শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান মিলনায়তন) শপিং কমপ্লেক্স, রেস্টুরেন্ট উচ্ছেদ করে দেবে।
চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই চুক্তিটি কার্যকর থাকবে দলিল স্বাক্ষর হবার দিন থেকে প্রথম পক্ষকে জমি হস্তান্তরের সরকারী লিজ দলিল করার দিন পর্যন্ত।
সেবা প্রদানের কথা বিবেচনা করে কোম্পানি পরামর্শ ফি হিসেবে পরামর্শককে (মীর ইকবাল, চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদ) এই প্রকল্পের ৫শতাংশ প্রদান করবে। ব্যয় সমূহে বলা হয়েছে, এই দলিল স্বাক্ষরিত হবার দিন চুক্তির মধ্যে থেকে ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। বাকি টাকা প্রক্রিয়া শুরুর পর দিতে হবে। চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়েছে গত বছরের ১৯ জুলাই। চুক্তিমতে, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মীর ইকবাল ইতিমধ্যেই ১০ কোটি টাকা পেয়েছেন।
এই চুক্তিপত্রে লিজদাতা এবং পরামর্শক হিসেবে আছেন চেয়ারম্যান মীর ইকবাল। আর স্বাক্ষী হয়েছেন তারই পুত্র মীর ইশতিয়াক আহমেদ লিমন। অপর দুজন স্বাক্ষী হলেন বর্তমান পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী আব্দুল ওয়াদুদ দারা এবং সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান।
এবিষয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মীর ইকবাল বলেন, ‘আমার কাছে বিভিন্ন সময় ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজার আব্দুল মান্নান আসতেন। তিনি এই জায়গাটিতে কিছু করার কথা বলতেন। বিভিন্ন পাটি আনার কথাও বলতেন। কিন্তু সেখানে আমার করার কিছু নাই। জায়গাটি জেলা পরিষদের, সরকারি। এটা ৯৯ বছরের জন্য আমি লিজ দিতে পারিনা। বছর বছর লিজ দিতে পারি। তাছাড়া ওরিয়ন গ্রুপকে আমি চিনিনা। তাদের সঙ্গে এধরণের কোন চুক্তি হয়নি আমার। তবে আমার পরিকল্পনা আছে এখানে জেলা পরিষদের টাকায় একটা ফাইভস্টার হোটেল তৈরি করার। অন্য কোন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেয়ার প্রশ্নই উঠেনা। তিনি আরো বলেন, চুক্তিপত্রে যে স্বাক্ষর আছে তা আমার নয়। এটা আমার জাল স্বাক্ষর। এই স্বাক্ষর আমি কোথাও করিনা।’
জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজা হাসান বলেন, ‘এভাবে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এককভাবে লিজ দিতে পারেন না। ২০১৭ সালের সর্বশেষ গেজেট অনুযায়ী ৯৯বছরের লিজ দেবার কোন সুযোগ নেই। সেটা করতে হলে সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয়।’
এবিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমি এধরণের কোন চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিনি। অরিয়ন গ্রুপের কারো সঙ্গে আমার কোন কথা হয়নি।’
অপর স্বাক্ষী মীর ইকবালের ছেলে মীর ইশতিয়াক আহমেদ লিমন বলেন, আমার বাবাকে ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র এটা। এধরণের কোন ঘটনা ঘটেনি।’অপর স্বাক্ষী পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী আব্দুল ওয়াদুদ দারা ফোন ধরেননি।
এবিষয়ে অরিয়ন গ্রুপের পরিচালক আশফাক রহমান বলেন, ‘আমার কাছে রাজশাহী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মীর ইকবালের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব আসে। প্রস্তাবটি নিয়ে আসেন সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান। আমরা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মীর ইকবালের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রস্তাবটি পজেটিভ মনে হয়েছে। তখন এগিয়েছি।
রাজশাহীর হোটেল এক্স এ আমরা বৈঠক করি। সেখানেই চুক্তি হয়। জেলা পরিষদের জায়গায়টিতে আমরা বহুতল ভবন করতে চাই। এজন্য হোটেল এক্স এর বৈঠকে মীর ইকবালকে আমরা ১০ কোটি টাকা নগদ ক্যাশ পরিশোধ করি। ওই সময় সেখানে সাক্ষি আব্দুল মান্নান, আব্দুল ওয়াদুদ দারা, লিমন উপস্থিত ছিলেন। তারা আমাদের কাছে এক বছর সময় নেয়। সেসময়সীমা এখনো পার হয়নি। এক সপ্তাহ আগেও মীর ইকবালের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি সময় চেয়েছেন। সময়সীমা যেহেতু এখনো আছে তাই অপেক্ষা করছি।
মীর ইকবালের অস্বীকার বিষয়ে আশফাক রহমান বলেন, ‘তিনি কখনোই আমাদের কাছে অস্বীকার করেননি। যদি এখন অস্বীকার করেন, তবে আমিও এ্যাকশন নেব। চুক্তি ছাড়াও যথেষ্ট ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে।
তিনি আরো বলেন, ‘এই চুক্তিপত্রটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকেই আমার কাছে এসেছিলো। আব্দুল মান্নান ছিলেন এর উদ্যেক্তা। উনারা বলেছেন, একচ্ছত্রভাবে এটার সর্বোচ্চ প্রতিনিধি চেয়ারম্যান মীর ইকবাল। এজন্য মীর ইকবালকে পরামর্শক করেই আমরা এগিয়েছি। আমরা ব্যবসায়ী মানুষ, ব্যবসার সার্থে এটা করেছি।
উনার ভেতরে কি আছে তা জানিনা। আমার কাছে মনে হয়েছে এতে আমরা লাভবান হবো, তাই এগিয়েছি। যদি অস্বীকার করেন, তবে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
এদিকে জেলা পরিষদের শত কোটি টাকার ৬বিঘা জমি লিজ দেবার খবরে প্রতি সচেতন নাগরিকদের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী কামাল বলেন, জেলা পরিষদের এই জমিতে জাতীয় নেতা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান এর নামে একটি আধুনিক মিলনায়তন রয়েছে। এই জায়গাটি বেসরকারি কোন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হলে এটা মেনে নেয়া হবে না।