মো: নুরে ইসলাম মিলন
রাজশাহীর কাটাখালী থানার ইমাতপুর এলাকায় বিয়ের নামে প্রতারণা করে জমি, বাড়ি ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি চাঞ্চল্যকর নানা অপরাধের অভিযোগ উঠেছে এক নারীর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ওই নারীর নাম ইশিতা আরফি সোনিয়া। তার বাবার বাড়ি দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে। একাধিক বিয়ে গোপনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বামীর কাছ থেকে কৌশলে অর্থ ও সম্পদ হাতিয়ে নেওয়াই তার মূল পেশা বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী দ্বিতীয় স্বামী মো: নুরুল ইসলাম। শুধু তাই নয়, প্রথম স্বামী আশরাফুল জামাল জুগলুলকে সঙ্গে নিয়ে ইশিতা গড়ে তুলেছেন এক অভিনব প্রতারণা ও মাদকের সিন্ডিকেট। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত ইশিতা আরফি সোনিয়ার প্রথম স্বামী আশরাফুল জামাল জুগলুলের বাড়ি রাজশাহী নগরীর শিরোইল কাঁচা বাজার এলাকায়। সেখানে ইশিতার একটি কসমেটিকসের দোকান ছিল। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর দ্বিতীয় স্বামী মো: নুরুল ইসলামকে বিনোদপুর কাজী অফিসে ৫ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে করেন এবং রাজশাহী কোর্টে নোটারি পাবলিক করেন। বিয়ের পর মো: নুরুল ইসলাম তাকে ৪ ভরি স্বর্ণালংকার উপহার দেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের শেষের দিকে জমি বিক্রি করে কাটাখালীর ইমাতপুর এলাকায় ৪ কাঠা জমি কিনে দেন স্ত্রী ইশিতা আরফি সোনিয়াকে। ২০২৩ সালের মধ্যে সেই জমিতে একটি বাড়িও সম্পূর্ণ নির্মাণ করে দেন নুরুল ইসলাম।
ভুক্তভোগী নুরুল ইসলামের অভিযোগ, ইশিতা আরফি সোনিয়ার এটিই শুধু দ্বিতীয় বিয়ে নয়; বরং বিয়ে করা তার একটি সুনির্দিষ্ট প্রতারণার কৌশল। তার একাধিক স্বামী রয়েছে যার মধ্যে প্রথম স্বামী আশরাফুল জামাল জুগলুল, দ্বিতীয় স্বামী মো: নুরুল ইসলাম, তৃতীয় স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান যার বাড়ি ঢাকায় এবং চতুর্থ স্বামী হিসেবে তারেক নামের এক ব্যক্তির সন্ধান মিলেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, প্রথম স্বামী জুগলুলের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইশিতা তার দূরসম্পর্কের ফুপাতো বোনের মেয়ের জন্মনিবন্ধন কার্ড সংগ্রহ করেন। এরপর জন্মনিবন্ধনের সেই নাম ব্যবহার করে নিজেকে জুগলুলের ফুপাতো বোন ‘স্বর্ণা’ পরিচয় দিয়ে ঢাকার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমানকে তৃতীয় বিয়ে করেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে টাকা ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে আসেন তিনি। ঢাকায় তৃতীয় স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে মামলা করলে পুলিশ জুগলুলের বাড়িতে এসে তল্লাশি চালায়। সে সময় পুলিশ সামনে থাকা নারীকে (যাকে স্বর্ণা বলা হয়েছিল) দেখে মোস্তাফিজকে জানালে তিনি জানান এটি তার আসল স্ত্রী নয়। পরবর্তীতে মোস্তাফিজ তার মুঠোফোনে থাকা ছবি বের করে দেখালে বেরিয়ে আসে যে, ওই নারী আসলে ‘স্বর্ণা’ নন, বরং প্রতারক ইশিতা আরফি সোনিয়া। এছাড়া তৃতীয় স্বামী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা থেকে অর্থ ও স্বর্ণ চুরি করে রাজশাহী পালিয়ে আসার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কাটাখালীর ইমাতপুরের ওই বাসায় ইশিতা ও তার প্রথম স্বামী জুগলুল একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করতেন, যা স্থানীয় এলাকابাসী স্বচক্ষে দেখেছেন। তারা দুজনেই মাদকাসক্ত এবং সরলমনা মানুষদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করে পরবর্তীতে তাদের বিয়ে করে অর্থ ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেয়। এছাড়া আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে যে, ইশিতা মাঝে মাঝে ঢাকার অভিজাত এলাকার বিভিন্ন মদের বারে খণ্ডকালীন (পার্টটাইম) বাউন্সার হিসেবে কাজ করেন এবং প্রথম স্বামী জুগলুল মাঝে মাঝে তাকে সঙ্গে নিয়েই ঢাকায় যাতায়াত করেন।
এদিকে নিজের মা-বাবার এসব অনৈতিক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ করায় তাদের প্রথম পক্ষের ১৫ বছর বয়সি কন্যা সন্তান তাসকিয়া পামিক জুসিকে গত দুই মাস আগে বোয়ালিয়া থানায় মিথ্যা মামলা দিয়ে এসিডি সেফ হোমে আটকে রেখেছেন ইশিতা—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। মেয়ের মুখ বন্ধ করতেই এই অভিনব পন্থায় তাকে ঘরছাড়া করা হয়েছে বলে জানা যায়।
গত ১ নভেম্বর রবিবার ভুক্তভোগী নুরুল ইসলাম জানতে পারেন যে, তার নিজ অর্থ ও পরিশ্রমে গড়া বাড়িতে প্রথম স্বামী আশরাফুল জামাল জুগলুলকে নিয়ে অবস্থান করছেন স্ত্রী ইশিতা আরফি সোনিয়া। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি ইশিতার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তা বন্ধ পান। এরপর তিনি থানায় গেলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরবর্তীতে স্থানীয় এলাকাবাসী বিষয়টি টের পেয়ে ওই বাড়িতে গিয়ে তাদের দুজনকে হাতেনাতে আটক করে রাখেন।
গত ৫ নভেম্বর বিকেলে ভুক্তভোগী নুরুল ইসলাম কাটাখালী থানায় গিয়ে আইনি সহায়তার মাধ্যমে তার স্ত্রী ইশিতা আরফি সোনিয়া ও প্রথম স্বামী আশরাফুল জামাল জুগলুলকে ওই বাড়ি থেকে কৌশলে বের করে দেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত স্ত্রী ইশিতা আরফি সোনিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, কাটাখালী থানার পুলিশ প্রশাসনের সাথে কথা বললে তারা জানান, বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।